১৫ই আগস্ট, ২০২০ ইং | ৩১শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

জানি না এই যুদ্ধে আমি নিজেও আহত কি না

নিজস্ব সংবাদদাতা ।। বরিশালে ধীরে ধীরে বাড়ছে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা। এখন পর্যন্ত গোটা বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় ১০১ জন রোগি শনাক্ত হয়েছে। যারমধ্যে বরিশালে ১জন, পটুয়াখালীতে ২ জন, বরগুনায় ২ জন করে চারজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে।

আর এখন আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ ও সাংবাদিকরাও রয়েছেন। তবে রোগি ও তাদের স্বজনদের করোনা উপসর্গ গোপন করার প্রবণতাও রয়েছে এ অঞ্চলে। ফলে নতুন করে উৎকন্ঠা ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে চিকিৎসাকর্মীসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে।

আবার করোনা সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগির খোঁজখবর না নেয়া, এমনকি উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তির মরদেহের দাফন সম্পন্ন না করে স্বজনদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে এই বরিশালে। শুধু তাই নয়, যে সব স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনা ওয়ার্ড কিংবা সংশ্লিষ্ট ল্যাব বা নমুন কালেকশনে নিয়োজিত রয়েছেন তাদেরও স্বজনদের এড়িয়ে চলার মতো ঘটনা ঘটছে। তারপরও সেবা দেয়ার প্রত্যয়ে অনেকেই কাজ করে যাচ্ছেন করোনায় আক্রান্তদের সেবা দিতে

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে ৮ দিনের দায়িত্বপালন শেষে সেবক (নার্স) লিংকন দত্ত তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন তার সেবা দিতে যাওয়ার চিন্তাধারা নিয়ে।

তিনি মাকে না বলে যুদ্ধে যাওয়ার সাথে কোভিড-১৯ এ আক্রান্তদের সেবা দিতে যাওয়ার মুহুর্তকে তুলে ধরেছেন। যেখানে তিনি পিড়িতদের কতটুকু শান্তি দিতে পেরেছেন আর নিজেও আহত যোদ্ধা কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন রেখেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লেখা তার স্ট্যাটাসটি হুবুহু তুলে ধরা হলো….

‘যখন একটু বড় হয়ে উঠছিলাম তখন পরিবারের বয় বৃদ্ধ দের মুখে মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস শুনে কখনও কখনও নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম।ভাবতাম বাংলার অসহায় মানুষ গুলো বাঁচার জন্য কত কিনা করেছে।মুক্তি যুদ্ধের প্রথম যুগের সন্তান হিসেবে কখনও কখনও এমন মনে হতে যে যদি আমি যদি সে সময় আজকের মতো বড় হতাম তাহলে হয়ত রাতের আধারে নিঃশব্দে মাকে না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতাম নতুন একটি মানচিএ আর স্বাধীনতার একটা দূরন্ত লোভে। ঠিক মনে হয় এমন অনুভূতির অনুভবেই ১৫/৪/২০ সকালে মাকে না বলেই ঘরে থেকে বের হয়েছিলাম (মৃত মায়ের ছবির দিকে না তাকিয়ে) যুদ্ধে যাব বলে। আটটি দিন যেন আটটি বছর। কিন্তু কস্ট বুকে নিয়ে ফিরলাম কেননা যুদ্ধ তো এখনও শেষ হয়নি। জানি না এ-র শেষ কোথায়। মহান স্রস্টা ই এই যুদ্ধের একমাএ নিয়ন্ত্রক। আমরা নিমিও মাত্র ।এই যুদ্ধে একজন সেবক (নার্স) হিসেবে পিড়ীতদের কতটুকু শান্তি দিতে পেরেছি জানি না তবে নিজেকে বাঁচানোর মিথ্যে আবরন (পিপিই) কখনও কখনও ইচ্ছে করেছে খুলে ফেলে আমার নগ্ন হাত পিড়ীত’র মাথায় রেখে হাসি মুখে বলি এ-ই তো কাল কেই আপনার ছুটি। জানি না এই যুদ্ধে আমি নিজেও আহত কি না। তবে ভগবানের কাছে প্রার্থনা এ-ই যুদ্ধের সীমা আর বাড়িও না।এখানে বাঁচার লোভে সন্তান তার প্রিয় পিতাকে ফেলে চলে যায়,স্ত্রী তার প্রিয় স্বামিনী র মৃত দেহ নিতে চায় না। অনেক বিভৎসতা এ-ই যুদ্ধে।দেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে আজ আমরা যারা যোদ্ধা তাদের পরীক্ষা দেবার সময় এসেছে। কোন কিছু পাওয়ার লোভে নয় আর আমাদের হারানোর ও কিছু নেই। কেন না আমরা যে মানুষ আর মানুষের জন্য কাজ করি আর করব। ভুলে যেওনা এক জন নার্স হিসেবে জলন্ত মোম বাতির দ্বীপ শিখা হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করা সেই মহান দিনটির কথা। (সামাজিক কারনে কোন রোগীর ছবি দেয়া হলনা)।’

সার্বিক বিষয়ে যখন কথা হয় তার সাথে তখন লিংকন দত্ত বলেন, এ ওয়ার্ডে দায়িত্বরত সকলকেই স্যালুট জানাই। বাহিরে কত কথা শুনি, কিন্তু নিজে যখন ৮ দিন দায়িত্ব পালন করলাম তখন দেখলাম চিকিৎসক-নার্সরা কতোটা আন্তরিক। দেখেছি নমুনা সরবরাহকারী বিভূতি ভূষনের সাহসিকতা। যাকে মনের ভেতর থেকে স্যালুট জানিয়েছি। তবে দুঃখ একটাই, পরিচিতো জনরা যারা জানেন আমি হাসপাতালে বা করোনা ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করছি, তারা কেউ কাছে আসতে চাননা, অনেকটাই এড়িয়ে চলেন। তবে যাই হোক না কেন মানুষকে সেবা দেয়া যখন কাজ আর পেশা, তখন এটি চালিয়ে যেতে চাই।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

অন্য খবর