১৬ই অক্টোবর, ২০২০ ইং | ৩১শে আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ইউনিফর্ম সমাচার

ইউনিফর্ম অর্থ হলো অভিন্ন, একরূপ, অবিচল ইত্যাদি তবে ইউনিফর্ম বলতে আমার বুঝি বিশেষ কোনো পোষাক কে। সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হওয়ায় আমরা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের ইউনিফর্ম ধারন করি এমনকি প্রকৃতিতেও এই ইউনিফর্মের ব্যাপারটা লক্ষ করা যায়।

প্রথমে প্রকৃতির ইউনিফর্ম ধারনের ব্যাপারটা খোলাসা করি – গাছপালা এবং ফসল তার লাইফসার্কেলের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন রং ধারন করে যা দেখে আমরা তার পরিপক্কতা আন্দাজ করতে পারি।

সে হিসেবে পাঁকা ফলের উইনিফর্মের রং হলুদ বা লাল এবং বৃষ্টির ইউনিফর্ম হলো কালো মেঘ।

মানবজাতি তার অঙ্গের বাহ্যিক আবরনের উপর আরেকটি আবরন লাগিয়েছে যাকে আমরা পোষাক বলি। এই আবরনের ভিতরের অংশ অবলোকন করায় বাধ্য-বাধকতা আছে তাই পোষাকের আকার – রংয়ে পার্থক্য করে পরিপক্কতা বা অবস্থান নির্নয়ে ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্যাশনেট লোকদের জন্য ব্যাপারটা ভালোই হয়েছে নাহলে সারা শরীরেই মেকাপ লাগাতে বা ট্যাটু করাতে হতো।

মানবশিশুর জন্মের পরই তাকে কাপড় দ্বারা আবৃত করা হয় এবং ইউনিফর্মের সাথে পরিচয়টাও তখনই হয়। এভাবে ভাবলে নবজাতকের ইউনিফর্ম হলো ছোট কাঁথা বা বড় তোয়ালে,যা দেখে আমরা বুঝতে পারি – সেন্সেটিভ প্রোডাক্ট, হ্যান্ডেল উইথ কেয়ার!

প্রযুক্তিগত উন্নতির সাথে সাথে শিশুরাও নতুন নতুন ইউনিফর্মের সাথে পরিচিত হচ্ছে, তাই বর্তমান আধুনিক শিশুদের ইউনিফর্ম হলো প্যাম্পার্স।

ধর্মগ্রন্থগুলোতেও এ ব্যাপারে নির্দেশনা আছে তাই পীর, সন্নাসী, সাধু পাদ্রী এবং তাদের মতাদর্শধারীদের পোষাকে ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। এ হিসেবে মুসলমান পুরুষের ইউনিফর্ম হতে পারে সাদা বা সবুজ পান্জাবী, টুপি আর মহিলাদের বোরকা – হিজাব। এভাবে ধর্মীয় নির্দেশনা অনুসরন করে অন্যান্য ধর্মালম্বীদেরও ইউনিফর্ম বের করা যায়।

স্কুলে ভর্তি হবার সাথে সাথে পরিচয় ঘটে প্রাতিষ্ঠানিক ইউনিফর্মের সাথে। স্কুল ড্রেসের সাথে যুক্ত হয় বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিফর্ম – যেমন – স্কাউট, বিএনসিসি, গার্লস গাইড ইউনিফর্ম।

স্কুলের ইউনিফর্ম পরিধান না করলে বিভিন্ন প্রকার শাস্তির সম্মুখীন হতে হয় তাই পরবর্তীকালে এটি নিয়ে ইমোশনও বেশী কাজ করে। স্বনামধন্য কলেজগুলোতেও ইউনিফর্মের ব্যবহার লক্ষনীয়। স্নাতক পর্যায়ে ইউনিফর্মের ব্যাপারে বাধ্য বাধকতা কমে আসলেও প্রাকটিক্যাল ক্লাশ, ল্যাব, ভাইভা, পেজেন্টেশনে এর ব্যবহার পর্যবেক্ষন করে বলা যায় যে – মেডিকেল এবং সাইন্স ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থীদের ইউনিফর্ম হলো এ্যাপ্রন, বিজনেস ফ্যাকাল্টির জন্য ফর্মাল শার্ট- প্যান্ট, টাই।

এদিক থেকে আর্টস ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থীরা কিছুটা স্বধীনতা ভোগ করে। স্বাধীনতার কথা এজন্য আনলাম কারন কিছু শিক্ষকেরা তাদের শিক্ষার্থীদের ভাইভা বা প্রেজেন্টেশনে জ্ঞানগত উপস্থাপনার চেয়ে পোষাকীয় উপস্থাপনা নিয়ে টেনশন করতে বাধ্য করেন।

সামরিক খাতে এবং খেলাধুলায় প্রফেশনাল ইউনিফর্মের ব্যাবহার সবচেয়ে বেশি তাই ইউনিফর্মের সুবিধাগুলো এখানেই আলোচনা করা যাক –
১. ভিজ্যুয়াল কমুন্যিকেশন।
২. আইডেন্টিটি।
৩. ইউনিটি।

এখানে পার্থক্য এইটুকু যে সামরিক ইউনিফর্ম পরিহিত সকলে সামরিক বাহিনীর সদস্য তবে স্পোর্টস ইউনিফর্ম বা জার্সি পরিহিতদের মধ্যে খেলোয়াড এবং সমার্থক উভয় ই আছে। পতাকার সাথে ম্যাচিং করেই জাতিগত ইউনিফর্মের রং নির্ধারন করা যায়। এভাবে ভাবলে বাংলাদেশীদের ইউনিফর্মের রং লাল – সবুজ তবে বাঙালী জাতির ইউনিফর্মের রং লাল – সাদা। আবার বাঙালী পুরুষের ঘরে থাকাকালীন বা কোয়ারেন্টাইনের ইউনিফর্ম হলো – লুংগি আর স্যান্ডো গেন্জি। এখানে দ্রষ্টব্য যে- ইউনিফর্ম শুধু ১০ জনকে এক করে না বরং ইউনিফর্ম বিহীন ১০ জন থেকে আলাদাও করে।

ততোটা বাধ্য বাধকতা না থাকলেও অন্যান্য প্রফেশনেও উইনিফর্মের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় – হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এর ইউনিফর্ম হলো প্লাস্টিকের হলুদ টুপি, কর্পোরেট জব হোল্ডারদের ফর্মাল ড্রেস, উকিলের কালো ব্লেজার।

সব ইউনিফর্ম সম্মান বাড়ায় না বা আকর্ষন ও করে না, যেমন – কয়েদির ইউনিফর্ম বা প্রাইভেট মেডিকেলের পেশেন্টের ইউনিফর্ম।মৃত্যুর পরেও কিন্তু আমরা একধরনের ইউনিফর্ম পড়ে শেষযাত্রা করি, মৃত ব্যক্তির ইউনিফর্ম হলো সাদা কাপড় বা কাফন।

এভাবে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা দৈব নির্দেশনায়, নিজেদের প্রয়োজনে, ইচ্ছায় – অনিচ্ছায় বাহ্যিক ইউনিফর্ম ব্যবহার করছি কিন্তু পোষাকের নীচের মানুষটার জন্য মানবীয় ইউনিফর্ম ধারন করতে পেরেছি কি?

আপনার জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি – মানুষের অন্তরের জন্যও একটা ইউনিফর্ম আছে যা পড়তে পারলে আত্বসম্মান বাড়ে, এবং সেটি বিশ্বাস, মানবতা আর সততায় তৈরি।

লেখক : সৈয়দ গোলাম মোক্তাদীর
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।
email: moktadirrezvee62@gmail.com

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

অন্য খবর