৪ঠা জুলাই, ২০২০ ইং | ২০শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

বরিশাল কোতয়ালী পুলিশের হঠাৎ ‘অপেশাদারী’ আচরণ!

স্টাফ রিপোর্টার ।। একটি মারামারির ঘটনার মামলায় আসামী আটক করতে গিয়ে এলাকাবাসীর সাথে অস্বাভাবিক আচরণ করেছেন কোতয়ালী থানার তিনজন পদস্থ পুলিশ সদস্য। স্থানীয়রা দাবী করেছেন, অভিযুক্তদের মধ্যে একজনকে গ্রেফতার করা হলেও কমপক্ষে তিনটি ঘরে ‘তান্ডব’ চালায় আভিযানিক দলটি। এসময়ে কারও ঘরের টিনের গেট, কাঠের জানালা, দোকানের ‘দাসা’ ভেঙ্গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইসাথে পাঁচ হাজার টাকা দাবী করেছেন পুলিশের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা।

যদিও বিষয়টি জানা নেই বলে জানিয়েছেন, কোতয়ালী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম আবদুর রহমান মুকুল। তিনি জানিয়েছেন, মামলাটি তদন্তানাধীন। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোন কথা বলতে পারবেন না। পুলিশ সদস্যদের অস্বাভাবিক আচরণের বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, কেউ যদি এমন আচরণের অভিযোগ তুলে থানায় লিখিত আবেদন করেন; তাহলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানা গেছে, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকার ২৫ নং ওয়ার্ডের সোহরাব খান হাউজিং এলাকায় ২৪ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পূর্বের একটি মামলার বিরোধের জের ধরে স্থানীয় বাসিন্দা খাদিজা আক্তার মুক্তিকে মারধর করে স্থানীয় দুই যুবক। এই অভিযোগ এনে আরেকটি মামলা করেন। মামলা নং ৩৯০। মামলার এজাহারে বর্ণনা করা হয়েছে, আসামী মামুন বাদী খাদিজা আক্তার মুক্তির তলপেটে লাথি মারে। অপর আসামী শিহাব হাওলাদার ওই নারীর ওড়না ধরে টান দেন। এছাড়াও ৩ থেকে ৯ নং আসামী মারধর করেন। ১০ থেকে ১২ নং আসামী চুলের মুঠি ধরে টানা হেচড়া করেন।

স্থানীয় মোস্তফা শিকদার জানিয়েছেন, খাদিজা আক্তার মুক্তির পিতা আইউব আলী ঢাকার একটি হাসপাতালে চাকরী করেন। ওইদিন (২৪ জুন) কোন ঘটনাই ঘটেনি। মূলত যাকে আটক করা হয়েছে সেই মামুন একটি নতুন বিল্ডিং তুলছেন। সেই বিল্ডিং নিয়ে ঝামেলা।

স্থানীয় ওই দোকানী আরও জানান, সন্ধ্যায় স্থানীয় গণ্যমান্যরা একবার শালিসি করেগেছেন। তখন পুলিশও ছিল। কিন্তু রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ করে তিন গাড়ি পুলিশ এসে ভাঙ্গচুর চালায়। আমি ঘটনার কিছু জানি না। কিন্তু পুলিশ এসে আমার দোকানের দাসা ভেঙ্গে ফেলে। শুধু শুধু হয়রানি করছে পুলিশ।

মোরশেদা বেগম বলেন, আমার ঘরের সামনের টিনের গেট লাথিমেরে ভেঙ্গে ফেলেন পুলিশ। তারা আমাদের কাছে ৫০০০ টাকা দাবী করেন। পুলিশ বলেছে, টাকা দিলে কোন হয়রানি করবে না। না দিলে নিত্য এসে ঝামেলা করবেন। আরেক বাসিন্দা হাবিব। তার ঘরের জানালা টেনে ছুটিয়ে ফেলেন পুলিশ। হাবিবের স্বজনরা জানান, আসামী ধরবে। তাতে আমরা কেউ বাধা দেই নাই। কিন্তু আমরা যারা আসামী না তাদের হুমকি-ধমকি, ঘরদোর ভাঙ্গার চেষ্টা চালান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাত দেড়টার দিকে তিন গাড়ি পুলিশ এসে যে ‘তান্ডব’ চালিয়েছে তা বড় কোন ঘটনার পরও পুলিশ তেমন তৎপরতা চালায় না। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা জানান, কিছুদিন আগে মাওলানা ভাসানী সড়কে মামুন মাতুব্বর নামে একজন খুন হন। তখন অভিযুক্ত খুনিকে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশে খবর দিলে দেড় ঘন্টা পর মাত্র তিনজন পুলিশ সদস্য এসে আটক রাব্বিকে নিয়ে যান। কিন্তু সোহরাফ খান হাউজিং এলাকার ঘটনায় কমপক্ষে পঁচিশ জনের বেশি পুলিশ সদস্য অভিযান চালায়। তাতে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। পুরো হাউজিং এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে।

অভিযোগ উঠেছে- ঘর, গেট, জানালা ও দোকানের দাসা ভাঙ্গায় অংশ নেন অভিযানে থাকা এসআই শাহজালাল মল্লিক, এএসআই সিদ্দিক ও আল আমিন। যদিও তারা এ ধরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এএসআই সিদ্দিক জানান, ঘটনার সময়ে আমি ছিলাম। কিন্তু টাকা চাওয়া ও ভাংচুরের বিষয়টি অবান্তর। এই পুলিশ সদস্য স্বীকার করেন, তিনি পুলিশি পোশাক ছাড়াই অভিযানে অংশ নেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাহজালাল মল্লিক বলেন, এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।

স্থানীয়দের অভিযোগের বিষয়ে বলেন, ঘর-জানালা-গেট ভাঙ্গার তথ্য সঠিক নয়। এমনকি আমরা কোন টাকাও চাইনি। আর আসামী ধরার সময় এলাকায় একটু আতঙ্ক সৃষ্টি হবে সেটাই স্বাভাবিক। যারা এসব অভিযোগ করছেন তারা মামলার আসামী। শাহজালাল আরও বলেন, মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের পর সব বলা যাবে। আর কোতয়ালী থানা পুলিশের সকল অভিযান আমাদের কমিশনার স্যার, ডিসি স্যার, ওসি স্যারের নির্দেশনায়ই হয়ে থাকে। তারা পুরো বিষয়টি জানেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, টিনের গেট, টিনের দেয়াল (বেড়া), জানালা ভাঙ্গা অবস্থায় রয়েছে। শুক্রবার সেখানে সাদা পোশাকে অভিযান চালাতে দেখা গেছে, এএসআই সুবজকে। যদিও তিনি অভিযানের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আইউব আলীর স্ত্রী মনোয়ারা বেগম ‘আন্টির’ সাথে গুরুত্বপূর্ন কথা বলতে গেছেন।

মামলার বাদী খাদিজা আক্তার মুক্তির বোন তানজিলা আক্তার মুক্তা মুঠোফোনে জানান, আহত মুক্তিতে হাসপাতাল থেকে বাসায় আনা হয়েছে। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে। মামলার স্বাক্ষী মুক্তা বলেন, পুলিশ আমাদের সর্বাত্মক সহায়তা করছেন। তাদের কারনেই আমরা টিকে আছি। তাছাড়া ঘটনাগুলো ‘ডিসি স্যার হ্যান্ডেল’ করতেছেন। কমিশনার স্যারের সাথে কথা হয়েছে। তিনিও আমাদের ন্যায় বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।

আরেক প্রশ্নের জবাবে মুক্তি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা শাহজালাল আঙ্কেলের সাথে আমাদের দীর্ঘদিনের সর্ম্পক। তিনি আমাদের মন মতই কাজ করেন। তাছাড়া তিনি আমার পিতার মতন। এর আগের ঘটনায় তিনিই আমার বোনকে সেইফ করেছেন।

মুক্তি বলেন, হাসপাতালে তথ্য নিতে এক সাংবাদিক এসেছিলেন। আমরা তার বিরুদ্ধেও মামলা দিব। কারন তিনি আমাদের সাথে ভালো আচরণ করেননি। এই মামলায় তারও নাম আসবে।

প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে তাদের দেওয়া কয়টি মামলা রয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে মুক্তি বলেন, তাতে আপনাদের দরকার কি! মামলার যত কাগজ আছে তা নিয়ে আপনি বসে থাকেন। দরকার হলে আপনাকেও মামলায় ‘ঢুকিয়ে’ দেওয়া হবে। এরকিছুক্ষণ পরে মুক্তি পুনরায় প্রতিবেদকের মোবাইলে কল করে, নাম, পত্রিকার নাম ও পিতার নাম জানতে চান। কারন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনার বিরুদ্ধেও মামলা রেডি করা হচ্ছে’।

সরেজমিনে মনোয়ারা বেগমের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি কোন কথা বলতে চাননি। মনোয়ারা বেগম বলেন, সাংবাদিকদের এখানে কোন দরকার নেই। পুলিশ আর আমরা বিষয়টি বুঝবো। উপস্থিত পুলিশ সদস্য সবুজ সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার জন্য মনোয়ারা বেগমকে অনুরোধ করলেও তিনি বলেন, তার হার্টে সমস্যা। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে ডাক্তার নিষেধ করেছেন।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনোয়ারা বেগম ও তার দুই মেয়ে তানজিলা আক্তার মুক্তা এবং খাদিজা আক্তার মুক্তি এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ৬টি মামলা দায়ের করেছেন। এসব মামলার প্রত্যেকটিতে দুটি বিষয় উল্লেখ রয়েছে। তা হলো শ্লীলতাহানী এবং যৌন হয়রানি।

যারমধ্যে, মনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে ২০১৪ সালে দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলা নং ০২/১৪ (সদর)। মনোয়ারা বেগম বাদী হয়ে ৫ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে মামলা দায়ের করেন। মামলা নং ২১৬। তিনি বাদী হয়ে আরও একটি মামলা দায়ের করেন ২০১৫ সালে। সেই মামলায় একজনকে আসামী করা হয়। মামলা নং ১৯৬। ২০১৯ সালে তানজিলা আক্তার বাদী হয়ে তার স্বামীর বিরুদ্ধে কোতয়ালী থানায় মামলা করেন। মামলা নং ৪৮৬। খাদিজা আক্তার মুক্তি ২০১৮ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে মামলা করেন দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলা নং (জিআর)৪৫২/১৮। আর চলতি বছরের ২৫ জুন খাদিজা আক্তার মুক্তি ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। উল্লেখিত সবগুলো মামলায় যৌন হয়রানি, মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসঙ্গত, এসব মামলায় ঘুরেফিরে দুই মেয়ে, মা ও ভাইকে স্বাক্ষী করতে দেখা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ১০ বছর ধরে প্রতিবেশীদের সাথে বিরোধ চলে আসছে আইউব আলী খানের পরিবারের সাথে। বস্তুত প্রতিবেশীদের উচ্ছেদ করে সেই জমি ক্রয়ের জন্য একের পর এক মামলা দিচ্ছেন পরিবারটি। তবে আইউব আলী খানের পরিবারের বিরুদ্ধে কোন মামলা নেই। হয়রানির শিকার পরিবারগুলো জানিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে করা একটি মামলারও সুষ্ঠ তদন্ত হয় না। আইউব আলীর দুই মেয়ে পুলিশের সাথে সখ্যতা রেখে নানান ভাবে তাদের হয়রানি করছেন। তাদের মারধর করেও উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা করছেন।

সর্বশেষ দায়ের করা মামলার আসামীরা হলেন, মামুন, শিহাব, বেল্লাল, আল আমিন, সায়েম, মোস্তফা, বাচ্চু, হাবিব, ফয়সাল, মোসাঃ ছুমা, হোসনেয়ারা বেগম ও ময়রুমি। পুরাতন মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেসব মামলায়ও উল্লেখিতরা আসামী রয়েছেন।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn

অন্য খবর